চেহারা পাল্টে এবেল তোপে ফিরে আসে

খুকি প্রায় চমকে ওঠে মানুষটাকে দেখে।
– মা, এটা কে?
তার মায়ের আঁচলের আড়ালে সে লুকায়। মা তাকে সাহস দিয়ে বলে,
– আরে বোকা মেয়ে, তোর খালু হয়। সালাম কর।
– আরে না মা, ভাল করে দেখো, খালু না, এ তো এবেল তোপে। শয়তান এবেল তোপে।
সবাই লজ্জায় পড়ে। মা ব্যাপারটা হালকা করে নেয়, কি যেন হইছে মেয়েটার, কিছুদিন থেকে সবাইকে একই কথা বলছে। এরপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, বোকা মেয়ে, তোর খালু এসেছে। তুই কি পাগল! তোর খালুকেও চিনিস না? সে এবেল তোপে হবে কেন?
– কিন্তু মা সে তোপে হয়েছে।
-এই চুপ বোকা কোথাকার। মা ধমক দেয়। স্বামীর প্রতি তাকিয়ে বলে, মাথাটা গেছে খুকির। এতটা খারাপ হবে কেন ওর খালু?
– বাচ্চা মেয়ে বাদ দাও।
তারা সামনে এগিয়ে যায়। আরো মানুষের সাথে মোলাকাত হতে থাকে। খুকি বিশ্ময়ে তাকায়। একই কথা সে বলতে থাকে।

ইদানিং এমন হচ্ছে খুকির, যাকেই দেখছে, এবেল তোপে ভাবছে। সে ভালোভাবেই জানে এবেল তোপি একটা জাত শয়তান। অথচ কোনোভাবেই মিল নেই যাদের, তাদেরও সে তোপে ভাবছে। কোনোভাবেই সে মানুষকে ভালো ভাবতে পারছে না।
– মা, আল্লাহর কিড়া কইছি, লোকটা তোপে।
– তুই কি এবেল তোপেকে দেখেছিস?
– হ্যা, তুমি যে সেদিন ঘুমানোর সময় বললা, এই তো সে আমার সামনে।
ভুলটা এখানেই হয়েছে। মেয়েকে ঘুমপাড়ানোর গপ্লের ছলে মা এবেল তোপের কথা বলেছে। শয়তান এবেল তোপে চেহারা বদলাতে পারে। সেই থেকে কিছু গোলমাল হয়েছে খুকির মাথায়। বিশেষ করে রোদ ঝিলমিলে বারান্দায়, অথবা রোদহীন আকাশে, হঠাৎ সে গোলমেলে হয়ে যায়। সে দেখতে পায় কারো কারো বদলে যায় চেহারা। স্বাভাবিক কিছুই আর দেখতে পায় না। এবং সে আজগুবি সব কথা বলে। যে মানুষটা নাই হয়েছে দুনিয়া থেকে, তাকেই সে জীবন্ত দেখতে থাকে। যেমন সবাই জানে এবেল তোপে মারা গেছে, তাকে পুড়িয়ে ফেলেছে শ্মশানে, যে ছিল লর্ড ক্লাইভের বংশধর। অথবা ভারতীয় এক ঘনিষ্ঠ কেউ, যে কিনা সারা বাড়ি ভর্তি মানুষের সামনে মরা মানুষের লাশ নিয়ে বেরিয়ে গেছে। সে খেয়ে ফেলেছে ভালো মানুষদের আত্মাদের। এমনকি ভালো নেতাদেরও সে খরিদ করেছে। এমনকি শিক্ষিত মানুষেরা, বুদ্ধিজীবীরা তারাও নাকি তার পেশাব পান করেছে। অথচ তাকে কখনোই মানুষ চিনতে পারে নাই। কারণ সে ছিল গিরগিটির মত চেহারা বদলাতে পারা প্রানী। হতে পারে নিশ্চুপ আর নিরীহ। এবং হিংসুটে আর হিংস্র। সে আবারো এসেছে। খুকি তাকেই দেখেছে। বারে বারে সে তাকেই ফিরে আসতে দেখে। শয়তান এবেল তোপে চেহারা বদল করে ফেরে এসেছে।

তার মা তাবিজ এনে দেয়। হাতে বাঁধে। কোমরে বাঁধে। বেশ কিছুদিন ঠিকই থাকে খুকি। কিন্তু, সে দেখতে পায়, এবেল তোপে জীবিত আছে। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে সে বলে, জানো মা, ওদের মাথার মগজে লুকিয়ে আছে এবেল তোপে।
– তুই ঘুমা!
সে ঘুমায়। আবার চোখ খোলে। আবার বলে, – জানো মা, বৈঠক ঘরার কোণে সে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে ছিল। ওই যে সেদিন, ঘরভর্তি মানুষেরা এল, যাকাতের কাপড় বিতরণ করল, আমি দেখেছি মা সেই মানুষটাকে।
এবং সে তার বাবার সাথে উলঙ্গ অবস্থায় দেখেছে। এমনকি সে তার মায়ের ঘরে নিয়মিত আসতে দেখেছে। প্রথমে বাড়ির পেছন দরজা দিয়ে, আর বাবার সাথে প্রকাশ্য সম্পর্ক হয়ে যাওয়ার পর থেকে একসাথেই বুক চিতিয়ে আসত সে। এবং সে তার প্রতিবেশীদের বাড়িতে ঢুকতে দেখেছে। এবং সে গাড়িতে চড়ে ঘুরতে দেখেছে। অফিসে বসে হা হা করে হাসতে দেখেছে।
ব্যাপারটা নিয়ে সে অভিযোগ করেছিল তার নানার বাড়িতে। মসজিদের ঈমাম, মেম্বার চেয়ারম্যান, থানা পুলিশ, আদালত- মন্ত্রি মিনিষ্টার- এমন কোনো জায়গা সে বাকি রাখে নাই- সে অনেক ঘুরেছে। মনে মনে সে প্রচার করেছে। কোথাও কেউ কানে নেয়নি তার কথা।
– এটা সেই মানুষ নয়রে খুকি, সে তোর খালু।
– না মা, খালু না, সে চেহারা বদল করে আবার এসেছে। গতবারের মতো,  প্রথমত সে প্রতিবেশির বাড়িতে ঢোকে। ভোটের সময়, সে পুরোদস্তুর ভালোমানুষ হয়ে যায়। তওবা করে আর অনেক দয়াবান হয় মানুষজনের প্রতি। খুব মিষ্টি কথা বলতে পারে। যুক্তি দিয়ে প্রচুর বলে। তোমার দুর্দশার কথা বলতে জানে। কিন্তু মা আমি নিশ্চিত সে মানুষটা জাদু জানে। মোহের মধ্যে তোমাদের মাথাকে আউলা করে দিতে পারে। সে লুকিয়ে রাখে ফাঁদ। আবারো সে ফাঁদে ফেলে মানুষকে মেরে ফেলবে। সত্যি মা, সে আবার এসেছে। তোমাদের শরীরের ওপরে উঠে সে তালগাছের মাথায় গিয়ে দাঁড়াবে। তোমরা শুধু পরপর মইয়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে। আর তোমাদের শরীরের মই দিয়ে এবেল তোপে তাল গাছের মাথায় গিয়ে বসে থাকবে।

মা চিন্তায় পড়ে যায়। যদি তার খালু এবেল তোপেই হয়ে থাকে, সেটা হবে বড়ই ভয়ানক। সে আবার চেহারা বদলাবে। লর্ভ ক্লাইভের মতো ভিনদেশি হয়ে, রাজ্য কায়েম আর লুট করে। যদিও মানুষটা সেই কৌশল বদলে ফেলেছে, আসল উদ্দেশ্য পাচার, সম্পদ যা সে মনে করে, সেটা হতে পারে মেধা, অর্থ কিংবা নারী, বিচার, ক্ষমতা কিংবা বাড়ি সবকিছুই সে গিলে খেতে পারে। এবং মুখ যেখানে রেখেছে, শরীর রেখেছে বিদেশে।
– কিন্তু খুকি, এমন নয় এ মানুষটা।
– আরে বোকা, তুমি শুধু ওর চোখের দিকে তাকাও, প্রথমেই দেখবি গোল গোল হায়েনা চোখ। ঠিক যেমনটা শয়তান এবেলের ছিল। তখনই বুঝতে পারবি মা এই মানুষটা সেই লোক। তার কথাগুলো তোমরা শোন না। কারণ তার কথাগুলো তোমাদের কানে ঢুকলে, তোমাদের শরীর তোলপাড় করে কথাগুলো আপনা থেকে রক্ত বের করে দিবে। আর তখনই দেখবে এবেল তোপে তোমাদের রক্তগুলো পাইপলাইন দিয়ে মাতাল হয়ে পান করছে। মূলত সে চেহারা বদলায় আর তোমাদের রক্তগুলো পান করে। এসময় লোকটা আসে। সবাইকে সালাম দিতে দিতে যেতে থাকে। এবার আপনাদের পাশে আমি আছি। আপনারা না থাকলেও আমি আছি। আপনারা না চাইলেও আমি আছি।
– আসসালামু আলাইকুম আপনারা কেমন আছেন? আমি আছি।
ওকে মায়ের পিছনে চিমটি কাটে পেছনে টানে। মা তাকে চিপে ধরে দাঁড় করিয়ে রাখে। ভায়টা কাটুক তোর।
– হাহা খুকি কেমন আছো! উত্তর শোনার সময়টা না দিয়েই সে কথাটা বলেই সামনে চলে যায়। কিন্তু খুকি বলে,
শয়তান মানুষ!
ভাগ্যিস মা মুখ চিপে ধরে।
লোকটা হাই হ্যালো করে চলে গেল। ফিরেও তাকায় না। সে গতকাল যা পরেছিল আজ তা বদলে ফেলেছে।
– এবার দেখলি, কাকে দেখেছিস? সে কি তোপের মতোন দেখতে? এতো ভয় তোর, আর আসবে না সে পাঁচ বছর।
আসবে মা, প্রতিবার সে চেহারা বদল করে আসবে, আর তোমার খুব কষ্ট হবে ধরতে। খুব সাবধানে সে চলাফেরা করে। বিশেষ এক ঘ্রাণ আছে লোকটির শরীরে, যেসব তার বাবা-মায়ের শরীর থেকে পাওয়া যেত। যে সময়টা লোকটি ওদের বাড়িতে আসত। সেই ছোটবেলা থেকেই সে খেয়াল করেছিল, তার বিশেষ একটা পরিচিতি আছে। মুখে যা বলে ভেতরটা সে লুকিয়ে রাখে শয়তানিতে। আবারো সামনে ইলেকশনে সে ভোটে দাঁড়াবে। খুকি ছবিটি দেখেই চিৎকার করে, সবাইকে জানিয়ে দেয়, কিন্তু এটাও সে বুঝতে পারে, তার কথা কেউ শুনবে না। এবেল তোপেকেই আবারো মানুষ বাছাই করে নিবে। হায় আল্লাহ, আবারো কোনো রক্তচোষকের ক্ষপ্পরে তারা পড়তে চলেছে। দু’হাতে নিজের মুখ নিজে ঢাকে সে। আর কোনো এবল তোপেকে সে দেখতে চায় না আর।

আরও পড়ুন

সর্বাধিক পঠিত