জারোয়াদের জঙ্গলে ( আজ শেষ পর্ব)

( আগে যা ঘটেছে—

 

রহিতদার সঙ্গে টিটো আর হীরু আন্দামানের জারোয়া গ্রাম লুকড়া লুংটা তয়ে মেডিক্যাল টিমের সঙ্গে গিয়ে ওহামে নামে এক জারোয়া ছেলের সঙ্গে টিটোর বন্ধুত্ব হয়েছে। টিটোকে জারোয়াদের বাড়ি চাড্ডাতে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছে ওহামে। সেখানে টিটো দেখেছে, জারোয়ারা কিভাবে জীবন যাপন করে। টিটোর সঙ্গে পাল্লা দিতে হীরু অন্য এক সমবয়সী জারোয়ার সঙ্গে জারোয়া গ্রামে বেড়াতে গিয়েছে। ওই জারোয়া যুবক তাঁর নিজের সংগ্রহে থাকা বেশ কিছু প্রাচীন মুদ্রা দেখিয়েছে হীরুকে। কলকাতার আন্তর্জাতিক বাজারে এই প্রাচীন মুদ্রার প্রচুর দাম হবে সেটা  বুঝতে পেরে হীরু সেগুলি হাতিয়ে নিতে চাইলে মুদ্রার মালিক জারোয়া যুবকটি আপত্তি করে। হীরু জোর করে সেগুলি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে দু’জনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। জারোয়া যুবকের ধাক্কায় হীরু ছিটকে পড়ে পাশের এক গাছের গুড়িতে লেগে মাথা ফেটে অজ্ঞান হয়ে যায়। এরপর………)

 

 

 

 

।। ১০  ।।

 

 

ওদিকে টিটোকে খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করে সন্তুষ্ট হতে না পেরে নাছোড় ওহামে আবার নিজের চাড্ডার ভিতরে একাই গিয়ে ঢুকলো। টিটো চাড্ডার বাইরের ফাঁকা এলাকায় দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ টিটোর নজরে এলো, বেশ কয়েকটি হরিন একসঙ্গে দল বেঁধে চাড্ডাগুলোর সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওহামের মা একই ভাবে বসে আবার নারকেল নিজে চিবিয়ে নরম করে শিশুটির মুখে গুঁজে দিচ্ছে। হরিনগুলোকে দেখে মহিলা কোন উত্তেজনাই দেখাচ্ছে না। যেন হরিন নয়, তাঁদের ঘরের পোষা ছাগলের দল উঠানে ঘুরে বেড়াচ্ছে ! টিটো এসব দেখে ফের আরও একবার অবাক হলো। একটু আগে ওহামে ওঁকে ঝলসানো শুয়োরের মাংস খাওয়াতে চেয়েছিল। টিটো কলকাতায় তাঁর বন্ধুদের কাছে শুনেছিল, হরিনের মাংস নাকি বেশ সুস্বাদু। যদিও ভারতে পশু শিকার, বিশেষ করে হরিন তো বটেই, একেবারে নিষিদ্ধ। তাহলে তো আন্দামানের এই দ্বীপের সেই আইন থাকার কথা। তবে কি জারোয়ারা এই দ্বীপপুঞ্জেও সেই আইন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ! যেখানে দেশের মূল ভূখন্ডের বাইরে থাকে, যাঁরা সভ্য সমাজ থেকে এতটা দূরে রয়েছে, যাঁরা এই বন্যভাবে জীবনযাপন করে, তাঁদের তো ভারতের সেই আইন জানার কথা নয়। তবে, সেই জারোয়াদের খাদ্য শিকার করা, যার বেশিরভাগই অবশ্যই হওয়া উচিত বিভিন্ন পশুর মাংস, তবে হরিন নিয়ে সেই জারোয়াদের এত উদাসীনতা কেন ! হরিনের দলটাও ওই জারোয়া মহিলাকে দেখে কোন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাই করছে না। বোঝাই যাচ্ছে, জারোয়ারা হরিনকে প্রানে হত্যা করে না !

এরমধ্যে নিজের চাড্ডার বাইরে বেরিয়ে এসেছে ওহামে। ওঁর হাতে কোন গাছের গুড়ি দিয়ে তৈরি বাটির মতো পাত্র। সেটাতে তরল জাতীয় কিছু সে নিয়ে এসেছে। নিশ্চই ওহামে আগের দিনের মতোই টিটোর জন্য ওঁর ঘরে আগে থেকে মজুত করে রাখা  মধু নিয়ে এসেছে।  টিটোর হাতে ওহামে ওই পাত্র তুলে দিলে টিটো দেখলো, ওঁর ধারনা একেবারেই  ঠিক। পাত্রের মধ্যে মধু রয়েছে। টিটো বুঝতে পারলো, ঝলসানো শুয়োরের মাংস দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন না করতে পেরে ওহামে তাঁর জন্য মধু নিয়ে এসেছে। টিটো হেসে ওহামের হাত থেকে সেই পাত্র নেওয়ার আগে হরিনের দলের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে ওহামের দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করলো। ওহামেও ঘুরে হরিনের দলগুলোর দিকে একবার ঘুরে তাকালো। টিটো এবার ওহামেকে দু’হাত দিয়ে তীর ধনুক চালানোর মতো মুদ্রা করে অদৃশ্যভাবে শিকার করার ভঙ্গি করে দেখালো। টিটোর সেই ভঙ্গি দেখে ওহামের মুখের অভিব্যক্তি সম্পূর্ন বদলে গিয়েছে। যেন টিটো ভীষন পাপ কাজ করার ইঙ্গিত করেছে। ওহামে টিটোর হাতে ওই মধুর পাত্র আগেই ধরিয়ে দিয়েছে। এবার সে নিজের দু’হাত তুলে মাথা দু’দিকে নাড়াতে নাড়াতে যেন জানাতে চাইলো, হরিন অতি পবিত্র প্রানী এবং ওঁরা কখনই হরিন শিকার করেনা। ওহামের এই আচরনের মানে টিটো যেমন বুঝতে পারলো, তেমনই অবাক হলো। হরিন শিকারের নিষিদ্ধ সরকারি আইন এই জারোয়া সমাজ না জানলেও টিটোর অজ্ঞাত কোন কারনে জারোয়ারা যে কখনই হরিন শিকার করে না, সেটা নিজের বোধগম্য হলো। সরকারি নিষেধাজ্ঞা না জানলেও জারোয়ারা যে হরিন শিকার করেনা – তাদের এই চিরাচরিত প্রথা বুঝতে পেরে জারোয়াদের প্রতি টিটোর সম্ভ্রম আরও বেড়ে গেল।

হরিনের দলকে ওহামে গুরুত্ব না দিয়ে টিটোকে হাত ধরে টেনে নিয়ে এলো উঠোনের একধারে। সেখানে গাছের কাটা গুঁড়ি দিয়ে বসার ব্যবস্থা করা রয়েছে। আশেপাশে বেশ কয়েকটি গাছের কাটা গুঁড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ওহামে টিটোকে তার একটাতে বসার ইঙ্গিত করে হাত দিয়ে পাত্র থেকে মধু খাওয়ার অভিনয় করে দেখালো। টিটো তাঁর ডান হাতের তর্জনী ডুবিয়ে সেই পাত্র থেকে কিছুটা মধু তুলে মুখে দিল। সত্যি, এই মধুর কি অপূর্ব স্বাদ এই জঙ্গলের। টিটো নিজের আঙ্গুলে মধু নিয়ে মুখে দিতেই ওহামে তাঁর ডান হাতের পাঁচ আঙ্গুল ডুবিয়ে দিল পাত্রের মধ্যে। তাঁর পাঁচ আঙ্গুল তো বটেই, হাতের তালুতেও লেগে যাওয়া মধু মুখে নিয়ে চেটে চেটে খেতে লাগলো। গৃহকর্তা নিজে আগে টেস্ট করে, অতিথিকে সেটা দেবে এবং দেওয়ার পরে প্রথমে অতিথিকে দেওয়া উপহার খাদ্যবস্তু খাবে,  তারপরে অতিথিকে দেওয়া পাত্র থেকে গৃহকর্তা খাবে, জারোয়া সমাজে এটাই বোধহয় নিয়ম। এখানে এঁটোর কোন বালাই নেই। এর আগে ঝলসানো মাংসও ওহামে নিজে খেয়ে টেস্ট করে দেখেছিল। এঁটোর ব্যপারটা তখনও মানেনি সে। নিজে আগে কোন খাদ্যবস্তু খেয়ে টেস্ট করে খাওয়ার উপযোগী হলে, তবেই বোধহয় এঁরা অতিথিকে হয়তো খেতে দেয়। যে কারনে ঝলসানো মাংস আগে পরীক্ষা করে খাওয়ার উপযোগী না হওয়ায় টিটোকে খেতে দেয়নি ওহামে। তবে এই পাত্রের মধু আনতে চাড্ডার ভিতরে ওহামে একা গিয়েছিল। টিটো তখন চাড্ডার বাইরে হরিনের দল দেখতে ব্যস্ত ছিল। মধু আগে সে টেষ্ট করে এসেছে কি না, টিটো সেটা অবশ্য জানে না। তবে ওঁর হাতে মধুর পাত্র তুলে দেওয়ার পরে টিটো প্রথমে মধু আঙ্গুলে তুলে মুখে দেওয়ার পরেই ওহামে মধু পাত্রের ভিতরে হাত ডুবিয়েছে। জারোয়াদের আতিথেয়তা টিটো যত দেখছিল, ততই অবাক হচ্ছিল। অবাক হয়েছিল, এঁদের এঁটো না মানার ঘটনা দেখেও। টিটোর মনে ধারনা হচ্ছিল, জারোয়ারা হয়তো যাঁকে একবার আপন করে মেনে নেয়, তাঁর কোন এঁটো বা অন্য কিছু আলাদা হিসাবে মানেনা। ভারতের মূল ভুখন্ডের বাইরে, এই জারোয়া অধ্যুষিত দ্বীপে, যাঁদের বন্য এবং আদিম হিসাবে সভ্য জগতে পরিচয়, তাঁদের মানসিকতার উদারতা অবাক করেছিল টিটোকে।

পাত্র থেকে মধু খেতে খেতে টিটো সময় আন্দাজ করার চেষ্টা করলো। ওঁর সঙ্গে সমান তালে পাত্র থেকে মধু খেয়ে চলেছে ওহামেও। সূর্য এই গভীর জঙ্গলে একমাত্র ঘড়ি। সেই সূর্য দেখে সঠিক সময় আন্দাজ করা সম্ভব নয় টিটোর পক্ষে। তবে কিছুটা আন্দাজ করতে পারে সে। কলকাতাতেও সময় পেলে টিটো সূর্য দেখে বটে, তবে সূর্য দেখে সময় নিরধারন করার কোন প্রয়োজন তাঁর পড়ে না। টিটোদের কলকাতার ফ্ল্যাট বাড়ির তিনটি ঘরেই ব্যাটারি লাগানো ঘড়ি রয়েছে। তবে সে বইতে পড়েছিল, দুপুরের আগে সূর্যের আলোর ছায়া উলটো দিকে বড় হতে শুরু করে। আর যখন মধ্য দুপুর হয়, মানে বেলা বারোটা বাজে, সেসময় সূর্যের আলোর ছায়া প্রায় শুন্য ডিগ্রির সমান হয়ে ছোট হয়ে যায়। পাশের ঘন জঙ্গলের গাছের ছায়া ফাঁকা এলাকায় পড়েছিল। টিটো সেখানে গাছের ছায়া দেখে সময় আন্দাজ করার চেষ্টা করলো। মনে মনে মেপে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, মাটিরে পড়া নিজের ছায়ার আকৃতিও। একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে সূর্যের অবস্থান দেখার চেষ্টাও করলো। নিজের ছায়া বা সূর্যের অবস্থান দেখে টিটো আন্দাজ করলো, এখনও নিশ্চই বেলা বারোটার খুব বেশি বাজেনি। তবে সময় বেশ বেড়েছে। মনে মনে টিটো ভাবলো, এখন সময় বেলা সোয়া বারোটা থেকে সাড়ে বারোটা বাজতে পারে।

ওহামের সঙ্গে এই গভীর জঙ্গলে জারোয়াদের চাড্ডায় আসার আগে সমুদ্রের ধারের মেডিক্যাল ক্যাম্প থেকে রহিতদা বলে দিয়েছিল, ওঁদের তাড়াতাড়ি মেডিক্যাল ক্যাম্পে ফিরে যেতে। দ্বীপের যেখানে রহিতদারা মেডিক্যাল ক্যাম্প করেছে, সেখান থেকে ওহামের চাড্ডায় আসার সময় কতটা সময় লেগেছিল, সেটা উত্তেজনায় আন্দাজ করতে পারেনি টিটো। এখান থেকে আবার সেই মেডিক্যাল ক্যাম্পে ফিরে যেতেও বা কতটা সময় লাগবে, সেটা ভেবে চিন্তায় পড়লো টিটো। মনে জোর আনতে টিটো ভাবলো, কতটা সময় আর লাগবে ! বড় জোর আধ ঘন্টা ! কিন্তু এখনই সেখানে ফিরে যাওয়ার জন্য রওনা দেওয়া উচিত ! আজ যদঈ এই দ্বীপে পৌঁছতে রহিতদাদের দেরি হয়েছে, কিন্তু গত দিন তো দুপুর দেড়টা নাগাদ রহিতদারা এই দ্বীপ থেকে মেডিক্যাল ক্যাম্প গুটিয়ে নিয়ে বারাটাঙে ফেরার জন্য ডুঙ্গি স্টার্ট করেছিল। সেই হিসাব ধরলে, এখনই ওহামেদের এই চাড্ডা থেকে রওনা না দিলে অসুবিধা হতে পারে।

টিটো সেই কথা ভেবে এবার ওহামেকে ডেকে এনে নিজের ডান হাত তুলে সূর্যের দিকে দেখালো। আবার সেই হাত দিয়েই ফিরে যাওয়ার ইশারা করে বোঝানোর চেষ্টা করলো। ওহামেও টিটোর ইশারার অর্থ বুঝেছে। সে মাথা উপরে নীচে নাড়াতে নাড়াতে ফের একবার নিজের চাড্ডায় গিয়ে ঢুকলো। একহাতে এবার কয়েকটা তীর আর একটা ধনুক নিয়ে বাইরে বেড়িয়ে এলো। টিটো দেখলো, এবার ওহামে সঙ্গে করে তাঁর গিফট করা মাউথ ওরগানটা সঙ্গে আনেনি। তারমানে সে জানে, টিটো মাউথ ওরগানটা তাঁকে উপহার দিয়েছে। ওহামের এই আচরনে খুশি হলো টিটো। ওঁর নিজের সন্দেহ ছিল, হয়তো সাময়িক ব্যবহার করার পরে মাউথ অরগানটা নিজের কোন কাজে লাগবে না বলে, সেটা হয়তো টিটোকে ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু ওহামের এধরনের কোন আচরন না থাকায় স্বস্তিতে টিটো ওহামের সঙ্গে রওনা দিল। পিছনে পড়ে থাকলো ওহামের মা আর ছোট ভাই। টিটোর সঙ্গে রওনা দেওয়ার আগে কিন্তু ওহামে মা-এর কাছে আর একবারের জন্যও ফিরে গেল না।

ওহামে এবারও আগে আগে চলেছে। যে পথ দিয়ে ওঁরা এসেছিল, সেই পথ এটা নয়। আগের মতো ঘন জঙ্গল না থাকলেও এবার ছোট ছোট বেশ কিছু নালা ওঁদের টপকাতে হচ্ছে। কোনও নালাতে রীতিমতো জলের স্রোত বইছে। যেসব নালা চওড়াতে ছোট, সেগুলো ওঁরা দু’জনে লাফিয়ে পেরিয়ে গিয়েছে। দু’একটা নালা বেশ চওড়া ছিল। সেখানে জলে নেমে পা ডুবিয়ে পেরিয়েছে। সেসময় ওহামে টিটোর হাত শক্ত করে ধরে ছিল। যেন টিটোর জলে কোন ধরনের অসুবিধা না হয়। একটা নালা পড়লো বেশ চওড়া। সেখানে ওহামে আগে নেমে জলের ভিতরে পাথর বা গাছের গুড়ি থাকলে সেটার উপরে পা দিয়ে আগে পার হচ্ছে। তারপরে টিটো সেই পথে যাচ্ছে। বেশ কিছুটা পথ ওঁরা পেরিয়ে চলে এসেছে। কিন্তু ওহামে মুখে কোন শব্দ করছে না। টিটোকে যা বোঝানোর ইঙ্গিতেই বোঝাচ্ছে। শুধু পা-এর নীচে ঝরে পড়ে থাকা শুকনো শুকনো পাতার উপর দিয়ে হাঁটার সময় টিটোর জুতোর আওয়াজ হচ্ছে। ওহামের সঙ্গে তীর ধনুক রয়েছে। তবে সেই তীরে কোন বিষ জাতীয় জিনিস মেশানো রয়েছে কি না, সেটা টিটো জানে না। একবার ভেবেছিল, এনিয়ে ওহামেকে জিজ্ঞাসা করবে। জারোয়াদের নিজস্ব ভাষা না জানায় এবং কি ভাবে আকার ইঙ্গিতে ওঁর কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইবে, সেটা বুঝতে না পেরে চুপ করে রয়েছে। এদিকের জঙ্গল খুব ঘন না হলেও গাছ গুলি নিজেদের কাণ্ড থেকে অনেক শিকড়ের মতো ডালপালা বের করে কেমন যেন জালের মতো তৈরি করে রেখেছে। টিটোকে রহিতদা আগে জানিয়েছিল, আন্দামানে অনেক ম্যানগ্রোভ রয়েছে। এর আগের দিন তাঁকে ম্যানগ্রোভের জঙ্গল দেখিয়েছিল রহিতদা। এখন সেই ম্যানগ্রোভের শিকড়ের নীচ দিয়ে মাথা নীচু করে এগিয়ে চলেছে ওঁরা দুজনে।

এবার ফের ওঁদের সামনে পড়লো বেশ চওড়া একটি নালা। সেখানে জলের স্রোত অবশ্য খুব বেশি নয়। নালার দুপাশেই ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের মাটি গত কয়েক দিনের লাগাতার বৃষ্টির কারনে শুধু ভেঁজা নয়, কেমন যেন কাদার মতো হয়ে রয়েছে। সেই পথ এতক্ষন খুব সাবধানে পেরিয়েছে ওঁরা দু’জনে। এবার এই নালার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে ওহামে। এদিকে ওদিকে দেখছে। কোথাও জলের উপর পাথরের চওড়া মাথা জেগে রয়েছে। সেটার উপরে পা দিয়ে এগোলে হয়তো পরের অংশ ডিঙানোর মতো জলের মধ্যে সুবিধাজনক পাথর বা শুকনো পড়ে থাকা গাছের গুঁড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। সেদিকেই প্রবল নজর ওহামের। সুবিধাজনক জায়গা খুঁজে পেতে নালার এদিকে ওদিকে ঘুরছে ওহামে। টিটোও ঘুরছে ওহামের পিছনে পিছনে। এই জঙ্গলের ভিতরের চওড়া নালার জলের উপরে তো আর ব্রিজ করা নেই, যে তার উপর দিয়ে খুব সহজেই ওঁরা নালার একদিক থেকে অন্য দিকে চলে যাবে ! এদিকে, পছন্দমতো সুবিধজনক জায়গা খুঁজে পেতে সময়ও নষ্ট হচ্ছে। টিটোর টেনশন বাড়ছিল। একবার মনে হলো, যেপথ দিয়ে ওঁকে নিয়ে এসেছিল ওহামে, সেই চেনা পথ দিয়ে ফিরলেই অনেক বেশি সুবিধা হতো। কিন্তু টিটো তো জঙ্গলের পথ চেনেনা। তাছাড়া এই পথে ওঁরা অনেকটা চলে এসেছে। এদিকে, মেডিক্যাল ক্যাম্পে নির্ঘাত রহিতদা চিন্তা করছে টিটোর জন্যে। এখন ফের আবার ফিরে গিয়ে পুরানো রাস্তা ধরতে গেলে আরও সময়ের অপচয় হবে। টিটোর মনে হলো, ওহামে বোধহয় টিটোকে নিয়ে তাড়াতাড়ি মেডিক্যাল ক্যাম্পের এলাকায় ফিরে যেতেই এই পথে এসেছে। গত সপ্তাহের টানা বৃষ্টির জন্যে এই পথের নালাগুলো যে এভাবে জলে ভরে যাবে, সম্ভবত ওহামের সেকথা মাথায় ছিল না। এই জঙ্গলের মানুষ হয়ে হয়তো ওহামে খুব সহজেই এই পথ দিয়ে চলে যেতে পারতো, কিন্তু টিটোর জন্যেই সে নালা পার হতে নানা উপায় খুঁজছে। একারনেই সে কোন ঝুঁকি নিচ্ছে না।

ওহামে ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের ভিতরে কিছুটা এগিয়ে গিয়েছে। টিটো ওঁর পিছনে রয়েছে। এক জায়গাতে টিটো দেখতে পেল, একটা গাছের ডালের বেশ বড়মতো শুকনো অংশ জলের মধ্যে ভেসে রয়েছে। এমনভাবে এই গাছের কালো গুঁড়ির মতো অংশ জলে পড়ে রয়েছে, টিটোর মনে হলো, এই গাছের গুঁড়িতে পা দিয়েই তো নালার জলের অনেকটা অংশ সহজেই টপকে যাওয়া যেতে পারে। জলের ভিতরে জেগে থাকা শুকনো গাছের ডালের কালো অংশের পরেই একটা পাথরের অংশও নজরে এলো টিটোর। এবার একটু অবাক হলো টিটো। নালার জল পার হওয়ার জন্যে এই অংশটা কি ওহামের নজরে আসেনি ! একটু কষ্ট হবে ঠিকই, কিন্তু এই শুকনো গাছের ভেসে থাকা অংশ আর পাথরের উপরে পা দিয়ে ওঁরা অতি সহজেই নালার ওপাড়ে চলে যেতে পারে। টিটো ভাবলো, এই অংশ দিয়ে নিজে জলের ওপাড়ে চলে গিয়ে ওহামেকে চমকে দেবে !

বৃষ্টির জল আর ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের কাদায় টিটোর চামড়ার জুতোর অবস্থা রীতিমতো খারাপ হয়ে গিয়েছে। কাদায় নেমে একটু জল ভেঙ্গে গাছের গুঁড়ির কালো অংশের দিকে পা দিতে এগিয়ে গেল টিটো।

হঠাৎ হ্যাঁচকা টান পিছন থেকে ! সেই টান এতটা জোরে ছিল যে, পা জল থেকে বাইরে এসে টিটো সোজা কাদায় পিছলে ছিটকে পড়েছে অনেকটা পিছনের দিকে ! টিটো তো অবাক ! কি হলো ! কে এভাবে টানলো তাঁকে। আর একটু হলেই পা  পিছলে মাটিতে কাদার মধ্যে পড়ে গিয়ে পা-এ চোট পেত সে ! টিটো মুখ তুলে দেখলো ওহামেকে। ওহামের চোখেমুখে আতঙ্ক। ওহামেকে দেখে টিটো বুঝতে পারলো তাঁকে টান মেরেছে ওহামেই। ওহামে উত্তেজিতভাবে জারোয়া ভাষায় কি যেন বলে চলেছে টিটোকে। এত উত্তেজিত এই দু’দিনে আগে কখনও ওহামেকে হতে দেখেনি টিটো। উত্তেজিত ওহামের জারোয়া ভাষার কিছুই বুঝতে পারছেনা টিটো। তাঁর মনে হলো কোন কারনে ভীষন রেগে রয়েছে ওহামে। কিন্তু টিটো কি এমন অন্যায় করতে যাচ্ছিল ! তবে কি তাঁর আগে নিজে নালার এই জল পেরিয়ে ওপাড়ে টিটো পৌঁছে যাক, সেটা ওহামে চায়নি ! ওহামের এই আচরন নিয়ে চিন্তা করার সঙ্গে, এই পিছন থেকে টান মারার কারন কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাটিতে পড়ে  থাকা টিটোর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ওহামে। টিটো একহাত ওহামের হাতে দিতেই, ফের টিটোকে মাটি থেকে টেনে তুললো ওহামে। টিটো ওহামের পিছন থেকে হঠাৎ টানার ফলেই ভেজা মাটিতে পড়ে  গিয়েছিল। ফলে ভেজা মাটির কাদা লেগে গিয়েছে তাঁর বারমুডা প্যান্টে। প্যান্ট কাদায় পড়ে যাওয়ায় কতটা ভিজেছে, সেটা দেখতে নিজের পিছন ঘুরে নজর দিল সে। কিন্তু ওহামে এভাবে তাঁকে টেনে মাটিতে ফেলে দিলো কেন ! ওহামেকে ব্যাপারটা ইশারায় জিজ্ঞাসা করার আগেই ওহামে মাটি থেকে একটা পাথরের তূকড়ো তুলে ছুঁড়ে মারলো ওই কাঠের গুঁড়িকে লক্ষ্য করে। একবার । দু’বার। কয়েকবারের পাথরের আঘাতে নড়ে উঠলো গাছের গুঁড়িটি। পরপর পাথরের আঘাত লাগতেই এবার টুপ করে জলে ডুবে গেলো সেটি।

এরপরে ধিরে ধিরে জলের ভিতর দিয়েই এগিয়ে চললো। একটু দূরে ভেসে গিয়ে ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের দিকের নালা থেকে উঠে গেল মাটিতে। টিটো সেদিকে তাকিয়ে এতটাই ভয় পেল, যে তাঁর মনে হলো তাঁর নিজের শিরদাড়া দিয়ে একটা স্রোত শরীরের নীচের দিকে নেমে যাচ্ছে। যেটাকে গাছের শুকনো মরা গুঁড়ি মনে করে পা দিয়ে নালার জল টপকানোর কথা ভেবেছিল, সেটি আদপে একটি প্রমান সাইজের কুমির। শিকারের সন্ধানে জলের নীচে শরীরের বাকি অংশ ঢুকিয়ে রেখে নাক সহ চোখের কিছু অংশ জলের উপরে তুলে রেখে ভেসে ছিল। ওহামের ক্রমাগত ঢিলের তাড়া খেয়ে কুমিরটি জল থেকে উঠে উলটো দিকের ম্যানগ্রোভের জঙ্গলে ঢুকে গিয়েছে। ওহামে টিটোকে আঙ্গুল দিয়ে সেই দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকলো, “আরুগে…… আরুগে……।” টিটো এবার আন্দাজ করলো, জারোয়া ভাষায় আরুগে কথার অর্থ কুমির। এই কুমিরের কারনেই ওহামে নালার জলের এই অংশ পাড় হওয়ার আগে নানা কথা চিন্তা করে এড়িয়ে যাচ্ছিল।

অবাক হয়ে টিটো ভাবলো, সে কি ভীষন ভুল কাজ করতে চলেছিল। কাঠের গুঁড়ি মনে করে সে কি না জলে ভেসে থাকা কুমিরের গায়ের উপর পা দিয়ে নালার জল টপকে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, কেবলমাত্র ওহামেকে কিছুটা চমকে দেবে বলে ! আর ওহামে যদি ঠিক সময়ে ওঁকে পিছন থেকে হ্যাঁচকা টান না মারতো, মাটিতে ওভাবে ফেলে না দিত, তবে টিটো এতক্ষনে ওই কুমিরের শিকার হয়ে যেত ! ভাবতেই সারা শরীরে কাঁটা দিচ্ছে টিটোর। এবার কলকাতার বাড়িতে বসে মা-এর করা সাবধান বানী মনে পড়ে গেলো টিটোর। আন্দামানের জারোয়ারা মানুষখেকো না হলেও এখানে প্রতি পদে পদে যে মৃত্যু কিভাবে ওত পেতে রয়েছে, একটু অসাবধান হলেই নির্ঘাত মৃত্যু, সেটা নিজেই উপলব্ধি করলো টিটো। তাঁর মনে পড়লো, আন্দামানে এসে পৌঁছনোর দিন পোর্টব্লেয়ার থেকে বারাটাঙ আসার পথে যখন ওঁরা ঝিলকাটাংএ চেকপোষ্টে গাড়ির লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল, সেখানে সচেতনামূলক পোষ্টার দেখেছিল টিটো। ওই পোষ্টারে আন্দামানের বিভিন্ন এলাকাতে কুমিরের বিষয়ে নানা ধরনের সাবধানতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ ছিল।

 

 

 

।।  ১১  ।।

 

রহিতদাদের মেডিক্যাল ক্যাম্পে ফিরে এসে টিটো শুনলো এখানে একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গিয়েছে। হীরুদা মারাত্মকভাবে জখম হয়েছে। তাঁর মাথা ফেটে গিয়েছে। এক সদ্য পরিচিত জারোয়া যুবকের সঙ্গে হীরুদা জঙ্গলের ভিতরে ঢুকেছিল। প্রণবেশদা টিটোকে বললেন, “ তোমার রহিতদা হীরুকে বহুবার ওই জারোয়া ছেলেটির সঙ্গে জঙ্গলের ভিতরে যেতে নিষেধ করেছিল। কিন্তু ও কোন কথা শুনলে তো ! যাইহোক, আমরা সময়মতো খবর পেয়ে হীরুকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছি। আরও একটু বেশি সময় দেরি হলে কি যে হতো, সেটা বলা যাচ্ছেনা !” প্রনবেশদার কাছেই টিটো শুনেছিল, যে জারোয়া যুবকটির সঙ্গে হীরুদা জঙ্গলের ভিতরে গিয়েছিল, তাঁর নাম ওয়াঙ্গে। হীরুদাকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গলের দিকে রওনা দেওয়ার আগেই রহিতদা নাকি ওই জারোয়া ছেলেটির নাম জেনে নিয়েছিল।

“কিন্তু হীরুদা এখন কোথায় ?”, উদ্বেগে জানতে চাইলো টিটো।

প্রনবেশদা জবাব দিলেন, “কোথায় আর থাকবে ! আমরা ওঁকে নিয়ে এসে মেডিক্যাল ক্যাম্পের একধারে শুইয়ে রেখেছি। তুমি চাইলে ওঁর সঙ্গে কথা বলতে পারো। তবে সাবধান ! বেশি কথা বলবে না। ওঁর শরীর থেকে প্রচুর রক্ত বেরিয়ে গিয়েছে। আমরা আজ তাড়াতাড়িই ক্যাম্পের কাজ শেষ করে ফিরে যাবো।”

এদিকে ওহামে টিটোকে মেডিক্যাল ক্যাম্পে পৌঁছে দিয়ে রহিতদার সঙ্গে দেখা করে অন্য কোথাও চলে গিয়েছিল। টিটো সুস্থমতো ফিরে আসায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল রহিতদাও। ওঁকে দেখে বলে উঠেছিল, “তুই চলে এসেছিস ! তোর অপেক্ষাতেই ছিলাম। এদিকে হীরু তো এক কান্ড বাঁধিয়ে বসেছে !”

রহিতদা টিটোকে হীরুদার বিষয়ে ভেঙ্গে কিছু না বললেও, আসলে ঘটনাটি ঠিক কি হয়েছিল, সেটা জানতে কৌতুহল হচ্ছিল টিটোর। রহিতদা ওঁর সঙ্গে এইটুকু কথা বলেই ফের ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, মেডিক্যাল ক্যাম্পে যে ক’জন জারোয়া চিকিৎসার জন্য এসেছে, তাদের নিয়ে। প্রনবেশদা টিটোকে শুধু জানালেন, হীরুদার মাথা ফেটে যাওয়ার কথা। কিন্তু এঁরা কেউই বিস্তারিতভাবে কিছু বলছেন না। একমাত্র হীরুদাই তাঁকে সঠিক ঘটনা জানাতে পারে। একটু আগে টিটো নিজেও জঙ্গলের ভিতরে জারোয়াদের চাড্ডা থেকে ঘুরে এসেছে। সেখানে যথেষ্ট মজা করে ফিরেছে। জারোয়া সম্প্রদায় সম্পর্কে ভালো ধারনা নিয়ে ফিরেছে। জারোয়ারা তাঁর উপরে আক্রমন করা তো দূরের কথা, তাঁকে যথেষ্ট খাতির যত্ন করেছে। কিন্তু হীরুদার এমন কি ঘটলো, যে জারোয়াদের হাতে তাঁকে আক্রান্ত হতে হলো !

টিটো মেডিক্যাল ক্যাম্পের পাশের ছাউনিতে গিয়ে দেখলো, একটি ক্যাম্প খাটে শুয়ে রয়েছে হীরুদা। তাঁর মাথায় ব্যান্ডেজ কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা রয়েছে। গায়ের জামায় রক্তের শুকিয়ে যাওয়া দাগ দেখেই মালুম করা যাচ্ছে, আঘাতে ভালোই রক্তপাত হয়েছে। চোখ বন্ধ করেছিল হীরুদা। টিটোর উপস্থিতি টের পেয়েই এক রকম প্রায় লাফিয়ে উঠে হীরুদা বলতে শুরু করলো, “ আরে ! তুই ফিরে এসেছিস। সত্যি জারোয়ারা কি সাংঘাতিক রে ! দেখ, আমার কি অবস্থা করেছে। তুই তো দেখছি ঠিকই রয়েছিস ! আমার তো তোকে নিয়েই বেশি চিন্তা হচ্ছিল ! চেনা নেই, জানা নেই, একটা জারোয়া ছোকড়ার সঙ্গে চলে গেলি জঙ্গলের ভিতরে ! তোর ভাগ্য ভালো যে তোর কিছু হয়নি। আমি তো ভেবেছিলাম, না জানি তোর কি অবস্থা করে ছাড়বে !”

প্রায় এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে এবার থামলো হীরুদা। এদিকে প্রায় ভালোই রক্তপাতের কারনে প্রনবেশদা হীরুদার সঙ্গে বেশি কথা বলতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। সে কথা মাথায় রেখে টিটো শুধু জিজ্ঞাসা করলো, “সবই শুনবো। আগে শুধু এইটুকু বলো, তোমার শরীর এখন কেমন আছে ?”

“ আমার শরীর ঠিকই আছে রে ! শুধু অচেনা জায়গা বলে ঘাবড়ে যাওয়ায় মাথাটা ফেটে গিয়েছে। না হলে ওই জারোয়া ছেলেটাকে আমি বুঝিয়ে দিতাম, আমি কলকাতার ছেলে ! এই অসভ্য জারোয়াগুলোকে কি আমি ভয় পাই ! পাঠান জারোয়াদের সঙ্গেও আমি একা লড়ে যেতে পারি, জানিস তো !! আর এরা তো কোন ছাড় !”

টিটো হীরুদার কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল ! টিটোর মনে হচ্ছে, নির্ঘাত এই লাকড়া লুংটা দ্বীপের জারোয়াদের সঙ্গেই কোন পাকামি করতে গিয়ে মাথা ফাটিয়ে এসেছে। আর বলে কি না, নিকোবরের জারোয়া প্রজাতি পাঠান জারোয়াদের সঙ্গে লড়বে হীরুদা ! পাঠান জারোয়াদের তো রহিতদাদের মতো লোকেরাই এখনও এড়িয়ে চলে ! হীরুদা বা প্রনবেশদা মুখে যাই বলুক না কেন, টিটো নিশ্চিত, নেহাত কোন স্বাভাবিক ঘটনায় মাথা ফাটেনি হীরুদার। কারন হীরুদাকে সে খুব ভালোভাবেই চেনে ! জানে হীরুদার সব বিষয়ে না জেনে পাকামো করার চারিত্রিক গুনগুলোও। তবে এখন তাঁকে জানতেই হবে, বাস্তবে কি ঘটনা ঘটেছিল ! কি কারনে হীরুদার মাথা ফাটলো ! কারন সে যা দেখে এসেছে, জেনে এসেছে জারোয়াদের সম্পর্কে, সবই মিথ্যা হয়ে যাক, এটা সে নিজেও চাইছে না ! তাঁর নিজের জানা সব ঘটনাগুলো যে তবে মিথ্যা হয়ে যাবে ! আর যখন নিজে হীরুদার পাকামো করার মাত্রা সে জানে। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেনা টিটো, যে জারোয়ারা কোন সাধারন ঘটনায় হীরুদার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। আর হীরুদা যে কথাই জানিয়ে থাকুক রহিতদা বা প্রনবেশদাদের। টিটোর নজরে এসেছে, মাথা ফেটে গেলেও সেই ঘটনার বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়েনি নিজের পাকামো মার্কা কথাবার্তায়। টিটো নিজের মনে নিজের মতোই প্রতিজ্ঞা করে নেয়, যেভাবেই হোক, সত্যি ঘটনা তাঁকে জেনে তবেই এই দ্বীপ ছেড়ে যাবে সে। কিন্তু হাতে তো সময় খুবই অল্প। কি করে হবে এই ঘটনার সত্যি রহস্যের উদ্ঘাটন ! নিজের মনেই চিন্তা করতে করতে হীরুদার কাছ থেকে সরে এসে মেডিক্যাল ক্যাম্পের সামনের খোলা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে টিটো।

টিটো তো নিজে জারোয়াদের ভাষা জানেনা। তাই অন্য কাউকে জিজ্ঞাসা করে কোন লাভ হবেনা। জারোয়াদের সঙ্গে তাঁদের ভাষাতে কথা বলতে পারেন প্রনবেশদা, রহিতদারা। তাদের সাহায্য নিতেই হবে। কিন্তু এত কম সময়ে হীরুদার পাকামির মাত্রাটা জানা কিভাবে সম্ভব, সেকথাই ভেবে চলেছে টিটো।

টিটোর হঠাৎ নজরে এলো ওহামে তাঁর দিকেই ছুটে আসছে। যেন কিছু একটা বলতে চায় সে। ওহামের কাছে যদি কোনো ভাবে জানা যেত, হীরুদা কিভাবে আক্রান্ত হলো, আদপে কি ঘটনা ঘটেছিল, সেই ঘটনা। কিন্তু ওহামে তো তাকে যা বলবে, সবই হয় ইশারায়, নয়তো জারোয়া ভাষাতে। সেটাও তো একটা বড় অসুবিধা !  কাছে আসতেই টিটোর নজরে এলো ওহামের হাতের মুঠির ভিতরে কি যেন রয়েছে। ওহামে কাছে এসে টিটোর দিকে এগিয়ে এলো। জারোয়া ভায়ায় কিসব যেন উত্তেজিতভাবে টিটোকে হাত নেড়ে জানাতে লাগলো। টিটো তো ওহামের জারোয়া ভাষার কিছুই বুঝতে পারছেনা।

ওহামেকে জারোয়া ভাষাতে কথা বলতে দেখে ওঁদের কাছে এগিয়ে এলেন প্রনবেশদা। টিটো কৌতুহলে প্রনবেশদাকেই অনুরোধ করলো, ওহামের সঙ্গে কথা বলে তার মানে যেন উনি টিটোকে বুঝিয়ে দেন। এবার প্রনবেশদা ওহামেকে কাছে ডেকে নিয়ে মন দিয়ে তাঁর কথা শুনতে লাগলেন।

অনেকক্ষন কথা বলার পরে প্রনবেশদা ওহামে কিছু একটা বলতে ওহামে ফের ছুটে জঙ্গলের দিকে চলে গেল। এতক্ষন কথা বললেও প্রনবেশদাকে কিন্তু ওহামে নিজের হাতের মুঠি খুলে দেখায়নি। ওহামে চলে যেতেই প্রনবেশদা টিটোকে বললেন, “বিষয়টা তো রীতিমতো গম্ভীর। হীরু তাঁর ওই দূর্ঘটনার জন্য যা বলেছে, সেটার সঙ্গে তো ওহামের কথার কোন মিল নেই। ওহামের কথা যদি সত্যি হয়, তবে হয় হীরু আমাদের কাছে মিথ্যা বলেছে, নয়তো ওহামে সত্যি বলছে না। কিন্তু আমার  এতদিনের জারোয়াদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা বলছে, জারোয়ারা মিথ্যা কথা বলেনা। এই জন্য যে জারোয়া যুবকের সঙ্গে হীরুর গন্ডগোল হয়েছে, ঘটনাটি তাঁর নিজের মুখ থেকে শুনতে তাঁকে ডেকে নিয়ে আসতে বললাম ওহামেকে। দেখা যাক, সত্যি কি ঘটনা ঘটেছে !”  টিটো ভাবলো তবে তাঁর মনের আশঙ্কা অনেকটা ঠিক দিকেই যাচ্ছে তাহলে !

টিটো মুখে কিছু না বললেও, আগে থেকেই ওঁর নিজেরও মনে হচ্ছিল, কোথাও একটা কিছু গরমিল রয়েছে। নয়তো এভাবে হীরুদার মাথা ফাটতো না। তবু সে ওহামের জন্য প্রনবেশবাবুর সঙ্গে বসেই অপেক্ষা করতে লাগলো। প্রনবেশদার কাচ থেকে টিটো জানতে পারলো, হীরুদাকে এই ক্যাম্প নিয়ে আসার পরে সে নাকি বলেছে, ওই জারোয়া ছেলেটি পিছন দিক থেকে গাছের ডাল মেরে তাঁর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। কোন কারন ছাড়াই এই ঘটনা ঘটেছে। সূর্যের আলোর ছায়া দেখে জারোয়া ছেলেটি সজোরে মাথায় আঘাত করার আগেই হীরু মাথা সরিয়ে নেওয়ায় আঘাত কিছুটা হলেও কম হয়েছে। নয়তো, এতক্ষনে নাই রহিতদাদের নাকি হীরুর মৃতদেহ উদ্ধার করতে হতো।

সত্যি কি ঘটনা ঘটেছিল, সেটা জানতে বেশিক্ষন অবশ্য অপেক্ষা করতে হলোনা। টিটো দেখলো, ওহামে ফিরে আসছে। আর ওহামের সঙ্গে রয়েছে হীরুদার প্রায় সম বয়সি এক জারোয়া যুবক। এই জারোয়া যুবকটির বেশ সুঠাম চেহারা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে গায়ের শক্তিও হবে ভালোই। প্রনবেশদাকে দেখে হেসে কথা বলছে ওই জারোয়া যুবকটি। যার মানে, প্রনবেশদাকে চেনে এই জারোয়া যুবকটি। সে অনেক কথাই জারোয়া ভাষায় বলছে প্রনবেশদাকে। এবার সে নিজের কোমড়ে জড়ানো সামান্য কাপড়ের ভিতরে রাখা শুকনো পাতায় জড়ানো কিছু জিনিষ প্রনবেশদার হাতে তুলে দিল। টিটোও আগ্রহ চেপে রাখতে না পেরে জারোয়া যুবকের দেওয়া কি জিনিষ সেটা দেখতে প্রনবেশদার কাছে এগিয়ে গেল। প্রনবেশদা শুকনো পাতায় মেড়ানো বস্তুটি খুলে ফেলেছেন। পাতার ভিতর থেকে প্রনবেশদার হাতে ঝনঝন করে পড়লো কয়কটি পুরানো কয়েন জাতীয় জিনিষ। বেশ কয়েকটি হবে সেই মুদ্রার সংখ্যা। টিটোর মনে হলো, বেশ পুরানো আমলের আকারে বেশ বড় মাপের কয়েনগুলো অযত্নে কালো হয়ে গিয়েছে। টিটো আগেই প্রনবেশদার কাছে শুনেছিল, জারোয়াদের মুদ্রার প্রতি লোভের কথা। তাই সে অতটা অবাক না হলেও, প্রনবেশদার মুখের অভিব্যক্তি দেখে অবাক হলো।

প্রনবেশদা কয়েনগুলোকে ভালো করে পরীক্ষা করার জন্য ক্যাম্পের ভিতর থেকে বাইরে রোদের আলোয় গিয়ে দাঁড়ালেন। উলটে পালটে নেড়েচেড়ে কয়েনগুলি দেখছেন।  এবার উনি টিটোকে ডেকে বললেন, “দেখো, এগুলো ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর আমলের মুদ্রা। আন্তর্জাতিক বাজারে এগুলির দাম কয়েক লক্ষ টাকা। হয়তো এই জরোয়ার পরিবারের কোন পূর্ব পুরুষ সংগ্রহ করেছিল সেসময়ের কোন পর্যটক বা কোন ইংরেজ অভিযাত্রীর দলের কাছ থেকে এগুলো পেয়েছিল। ওই জারোয়া যুবকের কথা অনুযায়ী, এই কয়েনগুলো ওঁদের কাছে রয়েছে কয়েক পুরুষ ধরে !”

প্রনবেশদা টিটোকে যা বললেন, তার সারমর্ম হলো, হীরুদা জঙ্গলের ভিতরে গিয়ে এই জারোয়া যুবকটির কাছ থেকে কয়েনগুলো ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। টিটো তো  হীরুদার কীর্তিকলাপ শুনে অবাক ! রহিতদাদের সঙ্গে এই দ্বীপে আসার কারনে এই জারোয়া যুবকটি হীরুদার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে, নিজের চাড্ডায় নিয়ে গিয়েছিল। হীরুদাকে নিজের সংগ্রহে থাকা মধুও খাইয়েছে। তারপরে সরল মনে নিজের চাড্ডা থেকে এই পুরানো আমলের কয়েনগুলো নিয়ে এসে  হীরুদাকে দেখতে দিয়েছিল।  হীরুদা সেই প্রাচীন মুদ্রা দেখেই চিনতে পারে। হীরুদা হয়তো ভেবেছিল, জারোয়া যুবকটি  সরল। তাই সে অতি সহজেই মুদ্রাগুলো তাঁর সংগ্রহ থেকে হাতিয়ে নিতে পারবে। কিছু না বলেই হীরুদা নাকি দুটো কয়েন নিজের পড়ে থাকা হাফ প্যান্টের পকেটেও ঢুকিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু জারোয়া যুবকটি মুদ্রাগুলো নিজের কাছ ছাড়া করতে চায়নি। হীরুদা নাকি ইশারায় জারোয়া যুবকটির দিকে ইঙ্গিত করেছিল, মুদ্রাগুলো না পেলে সে ওই জারোয়া যুবকটিকে বন্দুকের গুলি দিয়ে হত্যা করবে। এরপরেই শুরু হয় হীরুদার সঙ্গে ওই জারোয়া যুবকের ধস্তাধ্বস্তি। আর জারোয়ার গায়ের শক্তির সঙ্গে না পেরে হীরুদা ছিটকে যায়। আর গিয়ে ধাক্কা লাগে কাছের একটি বড় গাছের গুঁড়ির সঙ্গে। আর তাতেই নাকি হীরুদার মাথা ফেটে যায়। জারোয়ারা কেউ হীরুদাকে  মেরে মাথা ফাটিয়ে দেয়নি। শুধু নিজেদের সংরক্ষিত সম্পত্তি রক্ষা করার চেষ্টা করেছিল। পরে হীরুদার ওই অবস্থা দেখে ওই জারোয়া যুবকটি নিজেই এসে রহিতদাদের মেডিক্যাল ক্যাম্পে খবর দিয়েছিল। তখন রহিতদারা আহত হীরুদাকে উদ্ধার করে মেডিক্যাল ক্যাম্পে নিয়ে এসে মাথায় ফেট্টি বেঁধে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে।

এবার প্রনবেশদাকে আরও কথা বলছিল ওহামে। ওহামে নাকি এখানে টিটোকে পৌঁছে দিতে এসেই অন্য জারোয়াদের কাছে খবর পায়, হীরুদার মাথা ফেটে গিয়েছে। সেই খবর শুনেই ওহামে ছুটে গিয়েছিল, ওই জারোয়া যুবকের কাছে, ঠিক কি ঘটনা ঘটেছে, সেটা জানতে। ওই জারোয়া যুবকটি হীরুদার সব কথা ওহামের কাছে খুলে বলে। সে এটাও জানায়, মাথা ফেটে যাওয়ার আসল কারন সে মেডিক্যাল ক্যাম্পের ডাক্তারদের কাছে জানায়নি। আসলে হীরুদার সন্মানের কারনেই নাকি সে এটা করেছে। টিটো ভাবলো, ঘটনাটি সত্যি হয়ে থাকলে জারোয়াদের তাঁদের মতো সাধারন মানুষের প্রতি মনোভাব এবং চিন্তাভাবনা কতটা বন্ধুত্বপূর্ন।

প্রনবেশদাকে ওহামে হীরুদার সব কথা বিস্তারিতভাবে জানিয়েছিল। প্রনবেশদা টিটোকে জানালেন, ওহামে নাকি প্রথমে টিটোকেই সব কথা বলতে চেয়েছিল। সেজন্য হীরুদার প্যান্টের পকেটের ভিতরে যে দুটো কয়েন ছিল, সেগুলো ওই যুবকের কাছ থেকে চেয়ে টিটোকে দেখাতে নিয়ে এসেছিল। আর বোঝাতে চেয়েছিল, জারোয়াদের আক্রমনে নয়, হীরুদার মাথা ফেটেছে এক দূর্ঘটনায়। তাঁকে কোন জারোয়া মেরে মাথা ফাটিয়ে দেয়নি। কিন্তু এত কথা জারোয়া ভাষায় টিটো বুঝতে না পারার কারনে প্রনবেশদাকে সব খুলে বলেছিল। প্রনবেশদা ওহামের কথার সত্যি যাচাই করতে ওই জারোয়া যুবকটিকে ডেকে নিয়ে আসতে নির্দেশ দেন। ওহামে কিন্তু সেসময় প্রনবেশদাকে নিজের হাতের মুঠিতে থাকা কোন কয়েনই দেখায়নি। ওহামে টিটোকে  ছেড়ে এখন অন্য জারোয়াদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত রয়েছে। এদিকে, প্রনবেশদাও সব কথা রহিতদাকে জানাতে উঠে গেলেন পরের ক্যাম্পে। যেখানে রহিতদা জারোয়াদের সঙ্গে তাঁদের চিকিৎসার বিষয়ে নানা কথা বলছিল। টিটো একা একা বসে হীরুদার এই আস্পর্দার কথা চিন্তা করতে লাগলো। ভেবে অবাক হলো, এত বড় ঘটনাকে হীরুদা কেমন জারোয়াদের উপর দিয়ে চালানোর চেষ্টা করেছে। হয়তো ভাবতেই পারেনি, সত্যি ঘটনা এভাবে সামনে এসে পড়বে।

এরমধ্যেই টিটো দেখতে পেল, রহিতদা আর প্রনবেশদা, দু’জনে জারোয়াদের দলটির কাছে গিয়ে কি যেন বলছে। দেখে আন্দাজ করলো, যাই কথা তাঁদের মধ্যে হয়ে থাকুক, মনে হয় রহিতদারা এই ঘটনায় যদি জারোয়াদের মধ্যে কোন ক্ষোভ হয়ে থাকে, সেটা মেটাতে পেরেছে। এরপরে টিটোর কাছে এসে দাঁড়ালো রহিতদা। বললো, “যা হওয়ার তা তো হয়েই গিয়েছে। হীরু নিজেও এই কথাগুলো স্বীকার করছে না। আর জারোয়াদের কাছে আমাদের দলের একটা সন্মান রয়েছে। আমরা ওঁদের সব বুঝিয়ে বলেছি। কিন্তু হীরু কাজটা খুবই খারাপ করেছে। যাইহোক, এখন এই সবের বিচার এখানে বসে করা উচিত হবেনা। আমাদের বারাটাঙ্গ ফিরতে হবে। আর হ্যাঁ, হীরু যেন এখন আর কিছু কথা এবিষয়ে জানতে না পারে !”

টিটো মনে ভাবলো, হীরুদা নিজেই নিজের অকাজের শাস্তি পেয়ে গিয়েছে। প্রথম থেকেই নিজের সঙ্গে হীরুদাকে নিয়ে আসার বিপক্ষে ছিল সে। কিন্তু বাড়ির লোকের চাপে হীরুদাকে নিয়ে আসার যে এরকম মাসুল ওঁকে দিতে হবে, ও নিজে তো বটেই, এমনকি রহিতদাদের পুরো মেডিক্যাল টিমকে ওহামে সহ অন্য জারোয়াদের কাছে এতটা অসন্মানিত হতে হবে,  সেই আন্দাজ ছিলনা।

মেডিক্যাল টিমের একজনকে দিয়ে টিটোর জন্য খাবারের প্যাকেট পাঠিয়ে দিয়েছে রহিতদা। টিটোর খিদে খুব একটা না থাকায় সে আস্তে আস্তে খাচ্ছিল। রহিতদা ওঁর কাছে এসে তাগাদা দিয়ে বললো, “তাড়াতাড়ি খাবার শেষ করে নে। আমরা এরপরেই রওনা দেবো। আর আজ ফিরে গিয়েই, তোদের দু’জনের কলকাতার ফিরে যাওয়ার টিকিট কেটে নেবো। অনেক হয়েছে আন্দামান ঘুরে দেখা !” রহিতদার এই আচরন,  এভাবে কথা বলার ভঙ্গি দেখে টিটোর মন খারাপ হয়ে গেল। সে ভাবতেও পারেনি, আজই তাঁদের ফেরার টিকিট কাটার কথা বলবে রহিতদা। সব হয়েছে ওই হীরুদার জন্যে। আরও কিছুদিন যদি রহিতদাদের সঙ্গে থেকে যাওয়া যেত, আবার যদি এই জারোয়া দ্বীপে আসার সুযোগ পেত, তবে কি ভালোই না হতো ! বিশেষ করে ওহামের সঙ্গে আবার দেখা হতো ! ওহামের আতিথেয়তা সে কিছুতেই ভুলতে পারছেনা !

রহিতদাদের ক্যাম্পের সব গুটিয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য রেডি করে নেওয়া হয়েছে। ডুঙ্গি দুটোও ফিরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এবার তো ওঁদের এই দ্বীপ ছেড়ে ফিরে যেতেই হবে ! টিটোর নজরে পড়লো হীরুদা একটি ডুঙ্গিতে চেপে বসেছে। তাঁর মাথায় বাঁধা রয়েছে ব্যান্ডেজ কাপড়ের ফেট্টি। গায়ের জামাতেও লেগে রয়েছে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। টিটো বিরক্তি আর ঘেন্নায় হীরুদার দিক থেকে চোখ সরিয়ে অন্য দিকে নিল। সে ইতিমধ্যে চেপে বসেছে ডুঙ্গিতে। তাঁর ডুঙ্গিতে রয়েছেন প্রনবেশদা ছাড়াও টিমের অন্য লোকজন। রহিতদা এবার চেপেছেন হীরুদার ডুঙ্গিতে। টিটো এবার চোখ ফেরালো দ্বীপের দিকে। কই, কোন জারোয়ার দলকে তো দেখা যাচ্ছেনা। সে ভেবেছিল, তাঁকে বিদায় জানাতে অন্তত ওহামে একবারের জন্য হয়তো আসবে ! কিন্তু সেও আসেনি। তবে কি হীরুদার কীর্তিতে জারোয়ারা ওদের অবিশ্বাস করতে শুরু করেছে। এমনকি ওহামেও ! মন খারাপ হয়ে গেল টিটোর।

ডুঙ্গি দুটো রওনা দিয়েছে। সমুদ্র এখন বেশ শান্ত। ডুঙ্গি এগিয়ে চলেছে শান্ত গতিতে।  আজ সবারই মন কেমন যেন ! সবাই চুপচাপ ! টিটোও চুপ করে ডুঙ্গিতে বসেছিল। চলে যাওয়ার সময় ওহামে দেখা করতে না আসার কথাই বারবার টিটোর মনে পড়ছে। মনে পড়ছে ওহামের চাড্ডায় কাটানো সময় গুলোকে। আর ওঁর মন তত খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

আরে ! সমুদ্রের ধারে দ্বীপের বালির উপরে ওটা কে ! উপরে দু’হাত তুলে নাড়ছে।  আর একহাত মাঝেমাঝে মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে কিছু দিয়ে বিচিত্র শব্দ করছে। শব্দটা এবার চিনতে পারলো টিটো। ওটা মাউথ ওরগানের শব্দ। তারমানে ওটা ওহামে। যাক, শেষে তাঁর জারোয়া বন্ধু ওহামে তাঁকে বিদায় জানাতে এসেছে। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে, টিটোর দেওয়া গিফট, সেই মাউথ ওরগানটিকেও। টিটো আনন্দে কেঁদে ফেললো। তাঁর বন্ধু, তাঁর ‘মিলাহোলে’, ওহামে ওঁকে অন্তত ভুল  বোঝেনি আজকের হীরুদার ওই কান্ডের জন্য। টিটো আনন্দে বাংলা ভাষাতেই ওহামের  উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠলো, সঙ্গে দু’হাত উপরের দিকে তুলে নাড়তে লাগলো। ওহামেকে টিটো বিদায় জানানোর ইঙ্গিত করলো। টিটো চিৎকার করে বলে উঠলো, “ ভালো থেকো বন্ধু। সুস্থ থেকো। ভালো থেকো।”

সেই আওয়াজ যে ওহামে কাছে পৌঁছচ্ছিল, টিটো বুঝতে পারলো, ওহামের মাউথ ওরগান বাজানোর ভঙ্গি দেখেই। ভাষা বুঝলো কি না, সেটা নিয়ে টিটো চিন্তিত নয়। অন্তত ইশারাটা তো বুঝতে পেরেছে। পৃথিবীর সভ্য জগতের থেকে আলাদা হলেও, এঁরা অনেক বেশি আবেগপ্রবন। ভাষাটা এঁদের কাছে হয়তো কোন সমস্যাই নয়। পৃথিবীর কোন দেশের সঙ্গে অন্য দেশের ভাষা এক ! কিন্তু ওহামের যে বন্ধুত্বের স্বাদ সে অল্প সময় হলেও পেয়েছে, সেটা সে কোনদিনও ভুলতে পারবে না।।

 

সমাপ্ত

 

 

(উপন্যাসের সব চরিত্রই কাল্পনিক। বাস্তবের সঙ্গে কোন মিল থাকলে, তা হবে সম্পূর্ন কাকতালীয়)

আরও পড়ুন

সর্বাধিক পঠিত